থাইল্যান্ডে ভারি বৃষ্টি ও বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৩ জনে দাঁড়িয়েছে। মঙ্গলবার দেশটির কর্তৃপক্ষ এ তথ্য জানিয়েছে।

এরই মধ্যে বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত রাজধানী ব্যাঙ্ককে পানি কমতে শুরু করেছে। তবে শহরের প্রধান বিমানবন্দর সুবর্ণভূমিতে এখনো স্বাভাবিক হয়নি পরিস্থিতি। কর্মী সংকটের কারণে অনেক ফ্লাইট বাতিল ও বিলম্বিত হয়েছে। আটকে আছে হাজার হাজার যাত্রীর লাগেজ।

 

 

রয়টার্স জানায়, বন্যার ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় সরকার বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ করেছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত করতে একটি বড় প্রকল্পও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। গত সপ্তাহে মাত্র তিন দিনে ব্যাংককে প্রায় ৩২০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এই পরিমাণ বৃষ্টি সাধারণত পুরো সেপ্টেম্বর মাসে শহরটিতে যতটা হয়, তার প্রায় সমান।

ব্যাংকক নিচু এলাকায় গড়ে ওঠা একটি বড় শহর। ফলে ভারী বৃষ্টির পর সেখানে দ্রুত পানি জমে যায়। এবারও অতিরিক্ত বৃষ্টিতে শহরের বিভিন্ন এলাকা পানিতে ডুবে যায়। ব্যাঙ্ককের গভর্নর চাদচার্ট সিত্তিপুন্ট বলেছেন, আগামী দুই দিনের মধ্যে শহরের প্রধান সড়কগুলো থেকে বন্যার পানি সরে যাওয়ার আশা করা হচ্ছে। তবে যেসব এলাকা এখনো পানিতে ডুবে আছে, সেসব জায়গা থেকে পানি পুরোপুরি সরে যেতে এক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

 

তিনি বলেন, যেসব এলাকায় পানি কমে গেছে, সেখানে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার কাজ শুরু হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে ভারী বৃষ্টি ও বন্যায় দেশজুড়ে অন্তত ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে চারজন ব্যাংককের বাসিন্দা। বন্যায় ব্যাংককসহ থাইল্যান্ডের ৪২টি প্রদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় দুই ডজন প্রদেশে বন্যায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এসব ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ৩৬৭ কোটি ডলার। বন্যার কারণে দেশটির অর্থনীতির ওপরও চাপ বাড়ছে। থাইল্যান্ডের অর্থনীতিতে পর্যটন খাতের বড় ভূমিকা রয়েছে। বন্যার কারণে যোগাযোগব্যবস্থা ও পর্যটন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় এই খাতেও প্রভাব পড়তে পারে।

 

 

ব্যাংককের প্রধান বিমানবন্দরগুলো চালু থাকলেও দেশটির সবচেয়ে বড় বিমানবন্দর সুবর্ণভূমিতে এখনো ভোগান্তি চলছে। থাইল্যান্ডের জাতীয় বিমান সংস্থা থাই এয়ারওয়েজ জানিয়েছে, তাদের প্রায় অর্ধেক কর্মী কাজে যোগ দিতে পারেননি। এতে বিমান সংস্থাটির স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। মঙ্গলবার থাই এয়ারওয়েজ প্রায় ৩০টি ফ্লাইট বাতিল করার পরিকল্পনা করেছে। ওই দিন ব্যাংকক থেকে নির্ধারিত মোট ফ্লাইটের প্রায় ৩০ শতাংশ এটি। এ ছাড়া বিমানবন্দরে থাই এয়ারওয়েজের প্রায় ৫ হাজার ৬০০টি ব্যাগ আটকে রয়েছে। থাই এয়ারওয়েজের প্রধান নির্বাহী চাই এমসিরি বলেন, গত দুই দিনে প্রায় সব ফ্লাইটই দেরিতে ছেড়েছে। সময়মতো ছেড়েছে ৩ শতাংশেরও কম ফ্লাইট। কর্মী সংকটের কারণে স্বাভাবিকভাবে বিমান পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। তিনি জানান, ব্যাঙ্কক থেকে থাই এয়ারওয়েজের ফ্লাইট কমিয়ে দেওয়ার এই পরিস্থিতি অন্তত আরও তিন দিন চলতে পারে।

বিমানবন্দরে যাত্রীদেরও ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। আজারবাইজান থেকে ব্যাংককে আসা এমির দেমিরোজ তার লাগেজ খুঁজতে বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছিলেন। এরপর তার মালয়েশিয়াগামী একটি ফ্লাইট ধরার কথা ছিল। তিনি বলেন, বিমানবন্দরে কেউ সঠিক তথ্য দিতে পারছেন না। কেউ তাদের সাহায্যও করতে পারছেন না। লাগেজ খুঁজে না পাওয়ায় পরের ফ্লাইটটি ধরতে পারবেন কি না, তা নিয়েও তিনি নিশ্চিত ছিলেন না। কর্মী সংকটের কারণে বিমানবন্দরের কার্যক্রম ব্যাহত হলেও থাই এয়ারওয়েজের ব্যবস্থাপনার সমালোচনা করেছেন দেশটির পর্যটনমন্ত্রী সুরাসাক ফানচারোয়েনওরাকুল।

 

 

তিনি বলেন, থাই এয়ারওয়েজের কিছু কর্মীকে অন্য বিমান সংস্থার কাজে পাঠানো হয়েছিল। চুক্তির আওতায় বিমানবন্দরে বিভিন্ন সেবা দেওয়ার জন্য এসব কর্মী প্রয়োজন ছিল। জরিমানা এড়াতেই তাদের সেখানে পাঠানো হয়েছিল বলে জানান তিনি। পর্যটনমন্ত্রী বলেন, এই পরিস্থিতি দেশের ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিমান সংস্থাটির ব্যবস্থাপনাকে আরো সক্রিয়ভাবে কাজ করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, ব্যবস্থাপনা যদি দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে না পারে, তাহলে তাদের পদত্যাগ করা উচিত। তবে মন্ত্রীর বক্তব্যের বিষয়ে মন্তব্য জানতে থাই এয়ারওয়েজের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা তাৎক্ষণিক কোনো জবাব দেয়নি।

বন্যার ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় মঙ্গলবার বড় অঙ্কের অর্থ অনুমোদন করেছে থাইল্যান্ডের মন্ত্রিসভা। প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল জানান, বন্যার প্রভাব মোকাবিলায় ৪০০ কোটি বাতের বেশি অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। এর পরিমাণ প্রায় ১১ কোটি ৯০ লাখ ডলার। এই অর্থ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে জরুরি সহায়তা ও পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যবহার করা হবে। এর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত করার জন্য আরো বড় একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে সরকার। এই প্রকল্পে ব্যয় হবে ১৬ হাজার কোটি বাত বা প্রায় ৪৮০ কোটি ডলার। প্রধানমন্ত্রী জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রায় আট বছর সময় লাগবে। মধ্যাঞ্চল, ব্যাংকক ও আশপাশের এলাকায় ভবিষ্যতে বন্যার ঝুঁকি কমানো এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা শক্তিশালী করাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।

 

 

থাইল্যান্ডের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি পর্যটন। তবে করোনাভাইরাস মহামারির পর থেকে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এ অঞ্চলের কয়েকটি দেশের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। এ বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত থাইল্যান্ডে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ১২ শতাংশ কমেছে। এই সময়ে দেশটিতে প্রায় ২ কোটি ১২ লাখ ৮০ হাজার বিদেশি পর্যটক গেছেন। বন্যার কারণে যোগাযোগব্যবস্থা, বিমান চলাচল ও বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় দেশটির পর্যটন খাতের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে।