যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যে প্রাণঘাতী বিষাক্ত ইনজেকশন প্রয়োগের মাধ্যমে এক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী আসামির রায় কার্যকরের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। দুই ডোজ প্রাণঘাতী ‘পেন্টোবার্বিটাল’ ইনজেকশন শরীরে দেওয়ার পরও অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছেন ক্রিস্টা পাইক নামের ওই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী।
বর্তমানে ন্যাশভিলের একটি হাসপাতালে ভেন্টিলেটর ও ইনটিউবেশনে চিকিৎসাধীন এবং সম্পূর্ণ অচেতন অবস্থায় রয়েছেন ক্রিস্টা। তার আইনজীবীরা আদালতে এক জরুরি আবেদনে জানান, ফাঁসি বা মৃত্যুকূপের মুখ থেকে ফিরে আসার পর তাকে প্রাণরক্ষাকারী চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ক্যানুলা করা ও ইনজেকশন দেওয়ার ফলে তার দুই হাতেই মারাত্মক ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে।
১৯৯৫ সালে ১৯ বছর বয়সী কলিন স্লেমোরকে হত্যার অপরাধে ক্রিস্টাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। ২০০০ সালের পর টেনেসিতে প্রথম নারী হিসেবে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। তবে এই ব্যর্থ চেষ্টার পর তার রায় কার্যকরের পুরো প্রক্রিয়া থমকে গেছে।
আইনজীবী স্টিফেন ফেরেল ও লুক ইহনেন ন্যাশভিলের আদালতে এক জরুরি আবেদনে টেনেসি ডিপার্টমেন্ট অব কারেকশনকে গত বুধবারের ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ড চেষ্টা সংক্রান্ত সব তথ্য ও প্রমাণ সুরক্ষিত ও সংরক্ষণ করার নির্দেশ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে রিপাবলিকান গভর্নর বিল লি বৃহস্পতিবার ঘোষণা করেছেন, ক্রিস্টা পাইকের মামলার পুরো ঘটনার একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ ও নিরপেক্ষ তদন্ত স্বাধীন কোনো তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পরিচালনা করা হবে। টেনেসির অ্যাটর্নি জেনারেল জোনাথন স্ক্রমেটির দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, ‘গভর্নর সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। আসল ঘটনা কী ঘটেছিল তা জানা প্রয়োজন।
অন্যদিকে হত্যার শিকার ভুক্তভোগী কলিন স্লেমোরের পরিবারকে পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পর্কে এখনো কিছু জানাননি সংশ্লিষ্টরা। জাস্টিস কোয়ালিশনের নির্বাহী পরিচালক রবার্ট ব্রেসওয়েল জানান, স্লেমোরের মা-বাবা ক্ষুব্ধ, হতাশ এবং মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছেন। টেনেসি রাজ্য প্রশাসন কোনো ধরনের স্বচ্ছতা দেখাচ্ছে না বলেও অভিযোগ তাদের।
ঘটনার দিন সকালে আইনি আপিলের কারণে মৃত্যুদণ্ড স্থগিত থাকলেও শেষ পর্যন্ত সন্ধ্যায় প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। গণমাধ্যমের প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, সন্ধ্যা ৭টা ২৬ মিনিটে ক্রিস্টা তার শেষ ইচ্ছা ও বক্তব্য প্রকাশ করেন। এরপর তাকে বিষাক্ত কেমিক্যালের জোড়া ডোজ দেওয়া হলেও তিনি শুধু নাক ডাকছিলেন এবং পুরোপুরি জীবিত দেখাচ্ছিল।
ডব্লিউপিএলএনের সাংবাদিক ক্যাথরিন সুইনি বলেন, ‘আমি গত বছর এবং এ বছরের প্রায় সব মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা কাভার করেছি। তবে এমন নজির নজিরবিহীন। সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি চরম বাজেভাবে সম্পন্ন হয়েছে।’
তবে টেনেসি ডিপার্টমেন্ট অব কারেকশন দাবি করেছে, তারা আইন ও নিয়ম মেনেই সব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তাদের মতে, ‘ব্যবহৃত কেমিক্যালটি সব সময়ই কার্যকর প্রমাণিত এবং বিধিতে এর বাইরে বাড়তি পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’
ক্রিস্টার অন্যতম আইনজীবী স্পাইভি গভর্নর লির কাছে ক্রিস্টার সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন করার (কম্যুটেশন) আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমেরিকার মৃত্যুদণ্ডের ইতিহাসে আর কোনো আসামি ক্রিস্টার মতো এমন দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি ভোগ করেননি।’
আইনজীবীরা জানান, তারা আগেই সতর্ক করেছিলেন যে ক্রিস্টার হাতের শিরা পাওয়া কঠিন, যা ইনজেকশন প্রয়োগে ব্যাঘাত ঘটাবে। আইনজীবী ফেরেল বলেন, ‘তার ভয় মৃত্যুর ছিল না, তার ভয় ছিল দীর্ঘমেয়াদি ও যন্ত্রণাদায়ক ট্রমাটিক এক মৃত্যুর। আর সেটাই ঘটেছে, শুধু প্রাণটুকু বেঁচে গেছে।’
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের এই ব্যর্থতার জের ধরে গভর্নর লি চলতি বছরের বাকি আসামিদের রায় কার্যকর স্থগিত করেছেন।
আমহার্স্ট কলেজের অধ্যাপক অস্টিন সারাত জানান, এটি একটি অত্যন্ত বিরল ঘটনা। অতীতে ১৯৪৬ সালে ১৫ বছর বয়সী উইলিস ফ্রান্সিস বৈদ্যুতিক চেয়ারে মৃত্যুদণ্ড থেকে বেঁচে গেলে আবার ইলেকট্রিক চেয়ারেই তার মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। একইভাবে ২০০৯ সালে রোমেল ব্রুম নামের এক আসামির শিরায় ইনজেকশন দেওয়া সম্ভব না হওয়ায় পরে ওহাইও সুপ্রিম কোর্ট জানান যে আইভি লাইন দেওয়া শুধু শুরুর ধাপ, তাই এটি ‘ডাবল জিওপার্ডি’ (একই অপরাধে দুবার সাজা) হিসেবে গণ্য হবে না।
তবে অধ্যাপক সারাতের মতে, ক্রিস্টা পাইকের বিষয়টি একেবারেই আলাদা ও নজিরবিহীন, কারণ বিষাক্ত কেমিক্যাল ইতিমধ্যেই তার রক্তে প্রবেশ করেছে। ফলে এখন তিনি আইনি ও চিকিৎসার এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন, যার কোনো অতীত দৃষ্টান্ত নেই।


